এ এইচ এম ফারুক
একদিকে নতুন সরকার শপথ নিলো, আরেকদিকে আমাদের মাঝে চলে এলো পবিত্র মাহে রমজান। রমজান মানেই সংযম, সহমর্মিতা এবং আত্মশুদ্ধি। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে রমজান এখন ইবাদতের প্রশান্তির চেয়ে দ্রব্যমূল্যের আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোজা আসার মাসখানেক আগেই বাজারের আগাম উত্তাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে। এবারের রমজান আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। কারণ, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় রমজান শুরু হলো। সদ্য নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করল।
page-top-ad
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরপরই বাজার সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এই সন্ধিক্ষণটি অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। যখন মানুষের স্বস্তিতে থাকার কথা, তখন বাজারের অস্থিতিশীলতা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ পর এবং সরকারের শপথের ১ বা ২ দিনের মাথায় রমজান শুরু হওয়া—এটি নতুন সরকারের সামনে কিছুটা চ্যালেঞ্জ। বাজারের এই অস্থিরতা যদি দ্রুত দমন করা না যায়, তবে জনমনে দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস থেকে মুক্তি দিতে হলে কেবল মুখে আশ্বাস নয়, বরং দৃশ্যমান অ্যাকশন প্রয়োজন।
সারা বিশ্বের চিত্র আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আরব বিশ্ব এবং উন্নত দেশগুলোতে রমজান, বড়দিন, থ্যাঙ্কসগিভিং কিংবা ইস্টার উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতায় নামেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে রমজান উপলক্ষে পণ্যের দাম কমিয়ে দেয়া হয়। এমনকি ইউরোপ-আমেরিকার অমুসলিম ব্যবসায়ীরাও মুসলিম ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ‘রমজান সেল’ দেন। সেখানে ব্যবসায়ীরা একে পুণ্য অর্জন এবং সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখেন।
কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটি ঠিক উল্টো। এখানে পবিত্র ঈদ, রমজান এবং ঈদুল আজহাকে দেখা হয় রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে। উৎসবের আগে যেখানে দাম কমার কথা, সেখানে আমাদের দেশে চাহিদা বাড়ার সুযোগে দ্বিগুণ মুনাফা লোটা হয়। এই ব্যবসায়িক অনৈতিকতা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; বরং একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়। অধিক মুনাফার লোভে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা কতটা ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্মত—সেই প্রশ্ন আজ কোটি মানুষের।
নির্বাচনী বছরগুলোতে সাধারণত সরবরাহ চেইন কিছুটা বিঘ্নিত হয়। রাজনৈতিক ডামাডোলের সুযোগে অসাধু মজুদদাররা পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে। গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারে এখনই চাল, ভোজ্যতেল ও চিনির দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। দাম বৃদ্ধির স্রোতে গা ভাসিয়েছে মুরগি, গরুর গোশত এবং মাছ ব্যবসায়ীরা। নির্বাচনের ঠিক পরপরই রমজান শুরু হওয়াতে প্রশাসনের নজরদারি যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দিকে বেশি থাকবে, সেই সুযোগটিই নিচ্ছে সিন্ডিকেট। এখনই যদি কঠোর প্রস্তুতি গ্রহণ না করা হয়, তবে রোজার প্রথম সপ্তাহেই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমার বাইরে চলে যাবে। তৈরি হবে সামাজিক অস্থিরতা।
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অভিশাপের নাম হলো ‘সিন্ডিকেট’। গুটি কয়েক বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী পুরো দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে জিম্মি করে রেখেছে। রমজান আসার আগেই তারা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির সুনিপুণ খেলা শুরু করে। চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কেন দাম বাড়ে? উত্তরটি সহজ—অদম্য লোভ।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা গেল এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে। বিইআরসি নির্ধারিত দামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাঠপর্যায়ে সিলিন্ডার প্রতি ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাখতে দেখা গেছে। সরবরাহ সঙ্কটের অজুহাত দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে। রোজা ও ঈদের সময় যখন রান্নার চাপ বাড়ে, তখন গ্যাসের এই দাম সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটে বড় আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়।
রমজানে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খেজুর। অথচ গত এক বছরে খেজুরের দাম প্রকারভেদে ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার খেজুরকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে গণ্য করে উচ্চ শুল্ক আরোপের যে অজুহাত ব্যবসায়ীরা দিচ্ছেন, তার অন্তরালে লুকিয়ে আছে মজুদদারির গল্প। আমদানি করা খেজুরের বিশাল মজুদ গুদামে রেখে রোজা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে দাম বাড়ানোর পায়তারা চলছে। ইফতারি থেকে খেজুর বাদ দেয়ার উপক্রম হয়েছে কোটি মানুষের। এই অমানবিক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের শেষ ভরসার জায়গা হলো টিসিবি। কিন্তু টিসিবির বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। আবার অনেক সময় পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গ্রাম পর্যায়ে টিসিবির কার্যক্রম এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। আসন্ন রমজানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দিতে হলে টিসিবির ট্রাকের সংখ্যা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিলে সফল হতে পারে:
১. টাস্কফোর্স গঠন: নির্বাচনের পরপরই বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে বড় বড় গুদামে ঝটিকা অভিযান চালাতে হবে।
২. গোয়েন্দা নজরদারি: পাইকারি বাজার ও কোল্ড স্টোরেজগুলোতে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। কারা মজুদ করছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে।
৩. লাইসেন্স বাতিল: কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করলে আমদানিকারকদের লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. টিসিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি: রমজানে টিসিবির মাধ্যমে সুলভ মূল্যের পণ্যের সরবরাহ অন্তত তিনগুণ বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. জিরো টলারেন্স: এলপিজি গ্যাসের নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করতে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৬. শুল্ক সমন্বয়: রমজান উপলক্ষে খেজুর, তেল ও চিনির মতো পণ্যের শুল্ক সাময়িকভাবে কমিয়ে আমদানিকারকদের এলসি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, দ্রব্যমূল্যের আগুন যদি নিয়ন্ত্রণে আনার যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তবে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে। মানুষ কেবল বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প চায় না, তারা চায় শান্তিতে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে। আমরা একটি স্বস্তির রমজান চাই। যেখানে প্রতিটি মানুষ ন্যূনতম ইফতার ও সেহরি সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে পারবে। ব্যবসায়ীদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এবং প্রশাসন তাদের দায়িত্ব পালনে কঠোর হোক—এটাই ১৭ কোটি মানুষের প্রত্যাশা। মনে রাখতে হবে—মানুষের পেটে ক্ষুধা রেখে কোনো উন্নয়ন বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হয় না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
farukkht@yahoo.com
মন্তব্য করুন