বাবুগঞ্জে তহশিলদারের বিলাসবহুল ভবন ঘিরে প্রশ্ন

দৈনিক দখিনের কন্ঠ
প্রকাশিত October 3, 2026, 15:35 PM
বাবুগঞ্জে তহশিলদারের বিলাসবহুল ভবন ঘিরে প্রশ্ন

বাবুগঞ্জ প্রতিবেদক :
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নে একজন সরকারি ভূমি কর্মকর্তার বিলাসবহুল বহুতল ভবন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। রহমতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার হিসেবে কর্মরত জহিরুল ইসলামের নামে বা তার পরিবারের মালিকানাধীন বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ওই ভবনের নির্মাণব্যয় নিয়ে এলাকায় চলছে নানা আলোচনা। স্থানীয়দের দাবি, ভবনটি নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং অনেকে এর সম্ভাব্য মূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে ধারণা করছেন।

একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এমন ব্যয়বহুল স্থাপনা নির্মাণের সামঞ্জস্য কতটা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ভবনটির প্রকৃত নির্মাণ ব্যয়, মালিকানা, অর্থের উৎস কিংবা সংশ্লিষ্ট সম্পদের বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ও সরকারি নথি যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সম্পদ-আয়ের হিসাব যাচাইয়ের দাবি উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহলে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, রহমতপুর এলাকায় নির্মিত ভবনটি সাধারণ আবাসিক ভবনের তুলনায় আকার, নির্মাণশৈলী ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বেশ ব্যতিক্রমী। ভবনের নির্মাণে ব্যবহৃত স্থাপত্যশৈলী ও দৃশ্যমান ব্যয়বহুল উপকরণ স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। এ কারণে ভবনটি নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে এলাকায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে একজন ভূমি কর্মকর্তার সম্পদ নিয়ে। কারণ ভূমি অফিসের একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে তহশিলদারের দায়িত্বের সঙ্গে জমি, খাজনা, ভূমি উন্নয়ন কর, নামজারি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম এবং ভূমি-সংক্রান্ত সেবার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ফলে ওই পদে কর্মরত কোনো কর্মকর্তার দৃশ্যমান সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের বিষয় হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও নজরে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরিজীবনের বৈধ আয়, পারিবারিক সম্পদ, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি, ব্যাংক ঋণ বা অন্য কোনো বৈধ আয়ের উৎস থাকলে সেসবের সঙ্গে ভবন নির্মাণের ব্যয়ের হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? যদি ভবনটি সত্যিই কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থের উৎস কী? ভবন নির্মাণের অর্থ কি কর্মকর্তার নিজের আয় থেকে এসেছে, নাকি পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের বৈধ আয়ের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে ভবনটির আনুমানিক মূল্য নিয়ে নানা ধরনের কথা ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি সংস্থা বা নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ভবনটির প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় প্রকাশ করেনি। ফলে স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত কয়েক কোটি টাকার হিসাবকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে এত বড় ও ব্যয়বহুল স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যখন, তখন সম্পদের উৎস যাচাই করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সচেতন মহলের মতে, সরকারি চাকরিতে থাকা কোনো কর্মকর্তার সম্পদের পরিমাণ যদি তার বৈধ আয়ের সঙ্গে দৃশ্যত অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিকভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় এবং অর্থের উৎস যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
বিশেষ করে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভূমি সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত এসব কর্মকর্তার দ্বারস্থ হতে হয়। কোনো কর্মকর্তাকে ঘিরে সম্পদ বৃদ্ধির প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব পুরো ভূমি প্রশাসনের ওপরও পড়ে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি সেবা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সরকারি পদে থেকে কোনো কর্মকর্তা যদি অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে তার সম্পদের উৎস খুঁজে বের করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আর যদি সম্পদ বৈধ আয়, উত্তরাধিকার, পারিবারিক ব্যবসা, ব্যাংক ঋণ বা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে অর্জিত হয়ে থাকে, তাহলে নথিপত্রের মাধ্যমে সেটি স্পষ্ট করতেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়।

এ কারণে রহমতপুর ইউনিয়নের ওই তহশিলদারের সম্পদ ও আয় নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে নিছক গুঞ্জন হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে তথ্য-নির্ভর যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা দরকার।

অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে, ভবনটির জমি কোথা থেকে কেনা হয়েছে, জমির দলিলে প্রকৃত মালিক কে, জমি কেনার সময় মূল্য কত দেখানো হয়েছে, ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং এসব অর্থের উৎস কী। এসব তথ্য যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ভবনটি ঘিরে চলমান আলোচনা থামার সম্ভাবনা কম।

একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা মানেই তিনি দুর্নীতিতে জড়িত, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দৃশ্যমান সম্পদ যদি সরকারি চাকরির বৈধ আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যা ও নথিপত্র সামনে আসা জরুরি। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ ও আয় সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রশাসনিক জবাবদিহিতারই অংশ।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রাথমিকভাবে তথ্য যাচাই করতে পারে। বিশেষ করে কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন এবং জমি-ভবনের কাগজপত্র যাচাই করা হলে ভবনটির প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র সামনে আসতে পারে।

এদিকে রহমতপুরে তহশিলদার জহিরুল ইসলামের এই ভবন নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে আরও কিছু মৌলিক প্রশ্ন। একজন সরকারি কর্মকর্তার আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা? ভবন নির্মাণের অর্থের উৎস কী? সম্পদের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়েছে কি না? নির্মাণকাজে সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

তাই বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার পরিবর্তে প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান। কারণ সত্যিই যদি সম্পদ বৈধ হয়, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার হবে। আর যদি সম্পদের সঙ্গে বৈধ আয়ের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পথও সুগম হবে।
রহমতপুরের এই বহুতল ভবন এখন তাই শুধু একটি ভবন নয়, বরং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ ও আয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, গুঞ্জন ও অনুমানের বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রকৃত তথ্য যাচাই করবে এবং ভবনটির মালিকানা, নির্মাণ ব্যয় ও অর্থের উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য জনসম্মুখে আসবে।

তবে এ বিষয়ে তহশিলদার জহিরুল ইসলামের বক্তব্য, ভবনটির প্রকৃত মালিকানা, নির্মাণ ব্যয় এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়, বরং একজন সরকারি কর্মকর্তার দৃশ্যমান সম্পদ ও বৈধ আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিই এখন নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের বিষয়।

Facebook Comments Box