নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
চট্টগ্রামে প্রায় অর্ধকোটি টাকার জিনিসপত্রসহ ১ প্রতারককে গ্রেফতার করেছে খুলশী থানা পুলিশ। খুলশি থানার সেকেন্ড অফিসার চৌকস পুলিশ অফিসার এস আই নাসিম এর দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
জানাগেছে, ফেসবুকে পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। একপর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস। সেই আশ্বাসে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মার্কিন ডলার ও এফডিআরের কাগজপত্র নিয়ে দেখা করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে মামলা দায়ের করেছেন চট্টগ্রামের এক নারী।
ভুক্তভোগী নারীর দাবি, দুই যুবক পরস্পর যোগসাজশে প্রায় ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ৯০০ টাকা মূল্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন।
এ ঘটনায় খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে এক আসামির বসতঘরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মার্কিন ডলার ও এফডিআরের রশিদ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী ফিরোজা আক্তার চৌধুরীর সঙ্গে প্রায় দুই মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পরিচয় হয় মামলার ১ নম্বর আসামি মো. মেহেদী হাসানের। বাদীর অভিযোগ, মেহেদী নিজেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
বাদীর স্বামী জাহাজের সাপ্লাই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়ায় মেহেদী তার স্বামীকে জাহাজের বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। মেহেদী তাকে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখাতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন বাদী।
একপর্যায়ে মেহেদী বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে টাকা ধার চাইতেন। তিনি টাকা দিলে মেহেদী পরবর্তীতে তা পরিশোধ করতেন। এতে তার প্রতি বাদীর আস্থা ও বিশ্বাস আরও বাড়ে বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
এরপর বিয়ের কথা বলে মেহেদী বাদীকে তার কাছে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে আসতে বলেন বলেন।
এরই প্রেক্ষিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি একটি কাঁধের ব্যাগে করে ১৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা নগদ, প্রায় ১৯ ভরি স্বর্ণালংকার, ১ হাজার ১৫০ মার্কিন ডলার এবং সাতটি এফডিআরের কাগজপত্র নিয়ে জাকির হোসেন রোডের সিক্রেট রেসিপি রেস্টুরেন্টের সামনে যান। এজাহারে এসব সম্পদের মোট মূল্য ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ৯০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে মেহেদীর কথামতো তার বন্ধু মামলার ২ নম্বর আসামি এম সাদমান সাকিব পিয়াল একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার নিয়ে তাকে নিতে আসেন। পরে তাকে উত্তর খুলশীর ২ নম্বর সড়কের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে মেহেদী গাড়িতে ওঠেন এবং তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে বাক্ষেট শপিং মলের সামনে গাড়ি থামান মেহেদী। এরপর নিজের ফেসবুক আইডি ডিজেবল করার জন্য আমবাগান রেলক্রসিং এলাকায় এক বন্ধুর কাছে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
এ সময় বাদীর সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, ডলার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ভর্তি ব্যাগটি গাড়ির পেছনের সিটে রেখে তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলা হয়।
বাদীর দাবি করেন, মেহেদী তাকে একটি রিকশায় নিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর মোবাইলে ফোন আসার কথা বলে রিকশা থেকে নেমে যান। কিছুক্ষণ পর সাদমান একটি মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে আসেন এবং মেহেদীকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত চলে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদী জানান, তিনি রিকশাযোগে তাদের পিছু নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে বাক্ষেট শপিং মলের সামনে ফিরে এসে দেখেন, সেখানে রাখা প্রাইভেটকারটিও আর নেই। এরপর মেহেদীর মেসেঞ্জারে একাধিকবার ফোন করলেও আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, মামলা দায়েরের পর খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ আঃ রহিমের নির্দেশে এসআই গোলাম মো. নাসিম হোসেনের নেতৃত্বে, এসআই মিজানুর রহমানসহ পুলিশের একটি দল তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানকালে ডবলমুরিং থানাধীন আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ২৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের তৃতীয় তলায় মেহেদী হাসানের বসতঘরের শয়নকক্ষ থেকে মামলার আলামত হিসেবে বেশ কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার আলামতের তালিকায় রয়েছে- ৩৫.৩০ গ্রাম ওজনের এক জোড়া স্বর্ণের চুড়ি; ৪৬.২৫ গ্রাম ওজনের দুই জোড়া স্বর্ণের চুড়ি; ১২.৩০ গ্রাম ওজনের একটি ভাঙা স্বর্ণের ব্রেসলেট; ৪.৪৪ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণের গলার চেইন; ৩০.৩০ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণের নেকলেস চেইন; মোট ৭.৬০ গ্রাম ওজনের তিনটি স্বর্ণের আংটি; ১ হাজার ১৫০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি হিসাবে মূল্য ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯০০ টাকা; ১ হাজার টাকা মূল্যমানের নোটের ছয়টি বান্ডিল, মোট ৬ লাখ টাকা; ওয়ান ব্যাংকের সাতটি এফডিআর রশিদ, প্রতিটিতে ৫ লাখ টাকা করে মোট ৩৫ লাখ টাকা; ‘CAT’ লেখা একটি নেভি-ব্লু রঙের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ; একটি সাদা রঙের Toyota Allion প্রাইভেটকার।
পুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া এফডিআরগুলোর মোট মূল্য ৩৫ লাখ টাকা এবং নগদ বাংলাদেশি টাকা ৬ লাখ।
এ বিষয়ে এসআই নাসিম জানান, এ ঘটনায় মো. মেহেদী হাসান ও এম সাদমান সাকিব পিয়ালের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৩৪ ধারায় মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার ২ নম্বর আসামি সাদমান সাকিব পিয়ালকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান চালানো হচ্ছে। উদ্ধারকৃত মালামাল মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে থুলশী থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ রহিম জানান, ভুক্তভোগী বাদীর অভেযোগ শোনার পর মামলা দায়েরর পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তথ্য প্রযুক্তির সহয়তায় খুলশী থানার একটি চৌকশ অভিযানিক দল একজন আসামী গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।