দখিনের কন্ঠ ডেস্ক
গত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) প্রকল্প অনুমোদন, টেন্ডারবাজি, নিম্নমানের কাজ এবং ভুয়া বিলের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ রয়েছে, সে সময়কার দুর্নীতিতে জড়িত অনেক প্রকৌশলী এখনো রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, আবার কেউ কেউ আছেন বহাল তবিয়তে। এমনই একজন হিসেবে আলোচনায় এসেছেন এলজিইডি প্রকৌশলী মো. ইকবাল কবির, যাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ, অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিসহ অভিযোগের পাহাড় থাকলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি কখনো শাস্তির আওতায় পড়েননি, বরং পেয়েছেন পদোন্নতি।
কে এই প্রকৌশলী ইকবাল কবির
অভিযোগ অনুযায়ী, মোঃ ইকবাল কবির ঝিনাইদহ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড উকিলপাড়ার কৃষক মো. রইছ উদ্দিন মোল্লার ছেলে। ২০০৮ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে এলজিইডিতে যোগদান করেন তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ। অভিযোগে বলা হয়েছে, যেখানেই কর্মরত ছিলেন, সেখানেই অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষের আখড়া তৈরি করেছিলেন এবং প্রতিবাদ, মানববন্ধন বা আন্দোলনের মুখে পালিয়ে গেলেও কখনো বিভাগীয় শাস্তি হয়নি তাঁর।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ইকবাল কবিরের প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের ৪৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও অভিযোগ অনুযায়ী তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবে সে তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তাঁকে নলছিটি থেকে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়।
২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর হাজীগঞ্জে যোগদানের পর সেখানেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানেও কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে সখ্য গড়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের সুযোগ করে দিয়ে আর্থিক সুবিধা নিতেন তিনি, এবং নির্মাণকাজ পেতে বা বিল তুলতে হলে ঠিকাদারদের তাঁর সঙ্গে নির্দিষ্ট সমঝোতা করতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল হাজীগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর বড়কূল পূর্ব ইউনিয়নের এন্নাতলি গ্রামে একটি সড়ক নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে উত্তাপ তৈরি হয়। তৎকালীন এলাকাবাসীর অভিযোগ ছিল নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও কাজের ধীরগতি নিয়ে, যার প্রতিবাদে তারা ইকবাল কবির ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ঘেরাও করে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি একটি বাথরুমে আশ্রয় নেন এবং কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে উদ্ধার হন।
অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী, ঢাকায় একাধিক প্লট-ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং নিজ জন্মস্থান ঝিনাইদহ সদরে বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন তিনি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টি এড়াতে অধিকাংশ সম্পদ স্ত্রী, সন্তান, শাশুড়ি, মা এবং অন্যান্য আত্মীয়ের নামে বেনামে কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে—যদিও এসব দাবির সত্যতা স্বতন্ত্র অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে ঘুষ, দুর্নীতি, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ইকবাল কবিরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে, এবং ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর সম্পদ ও নগদ অর্থের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রতিবাদকারীদের হুমকি-নির্যাতনের ভয় দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁর কর্মস্থলের কয়েকজন সহকর্মীর অভিযোগ, গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও সহকর্মীদের সঙ্গেও রূঢ় আচরণ করতেন তিনি।
এত অভিযোগ সত্ত্বেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তাঁকে নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত, চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে এলজিইডিতে সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ ও বিভাগীয় বিধিমালা অনুযায়ী দুর্নীতি বা অসদাচরণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ (যেমন প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের ভাইরাল ভিডিও) থাকা অবস্থায় পদোন্নতির সুযোগ থাকার কথা নয়। কিছু সূত্রের দাবি, এই পদোন্নতির জন্য তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন—তবে এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাইসাপেক্ষ। এই পদোন্নতি এলজিইডির যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ডক্টর আব্দুল মঈন খান দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট মহলে বাড়তি তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে জানতে সদ্য পদোন্নতি পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইকবাল কবিরের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।